প্রতারণার এ কী রূপ?

Posted on November 10, 2011

0



image

প্রতারিত হয়েছেন জীবনের শেষ বেলায় এসে, তবু হাসিটা মুখে লেগেই আছে

 

 

‘কলম লাগবে দাদু, কলম’_এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ১৯৮৯ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের কাছে কলম বিক্রি করেন তিনি। ‘কলম দাদু’ হিসেবেই তিনি পরিচিত সবার কাছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ পাস করেছেন ১৯৬৬ সালে। এরপর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন রাজশাহী গার্লস হাই স্কুলে। শিক্ষকতা করেছেন সিলেট, বগুড়া ও খুলনা গার্লস হাই স্কুলে। মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন স্বামীকে। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এসে ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন বছরখানেক। একদিন খুব অসুস্থ বোধ করলে ভর্তি হন ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসক জানান, তাঁর শরীরের ডান পাশের ভাল্বটি নষ্ট হয়ে গেছে। সেই থেকে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন তিনি। ২০০৭ সালে জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশনে এনজিওগ্রাম করার পর জানতে পারেন হার্টে ব্লক আছে।

৭৭ বছর বয়সী নিঃসন্তান এই নারীর নাম নাসেরা বেগম। থাকেন কল্যাণপুরে ৬/১ নম্বর বাড়ির একটি খুপরি ঘরে। কলমের ফেরিওয়ালা এই নাসেরা বেগম শিকার হয়েছেন প্রতারণার। তাঁর নামে এ বছরের মার্চ-মে মাসে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক লাখ টাকা (নাসেরার অভিযোগ অনুযায়ী) তুলে নিজেদের পকেটে পুরেছে একদল প্রতারক। অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার কথা বলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া ২০ হাজার টাকাও নিয়ে গেছে তারা। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, ইন্টারনেটের একটি পর্নো সাইটে মৌ পরিচয় দিয়ে ৭৭ বয়সী নাসেরা বেগমের মোবাইল নম্বরটা দিয়ে দিয়েছে প্রতারক চক্র। বিকৃত রুচির লোকরা প্রতিনিয়ত তাঁকে ফোন করে অশালীন কথা বলছে। পাঠাচ্ছে অশ্লীল এসএমএস। বাধ্য হয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে হচ্ছে কলম দাদুকে। মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙে পড়েছেন সবার প্রিয় কলম দাদু। নাসেরা বেগম, ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রী, অভিযুক্তদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্ত্রী এখন ফেরিওয়ালা! জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রাপ্যটা আমরা এভাবে দিলাম’ শিরোনামে এ বছরের ১৩ মার্চ বাংলা ব্লগে একটি পোস্ট দেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছা্ত্র এবং ‘গ্লোবাল আইটি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পুরকৌশলী মুফিদ বিন রাবি্ব। পোস্টটিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। ২০ মার্চ আরটিভিতে ‘মানবতার চোখ’ নামে একটি অনুষ্ঠানে নাসেরা বেগমকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। সে অনুষ্ঠানে মুফিদের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র হামিন আহমেদ তাপসও উপস্থিত ছিলেন। ২৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মাঠে নাসেরা বেগমকে নিয়ে বৈঠক করেন তাপস, মুফিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ছাত্র অরণ্য, নীল, আরিফ, সাজিদ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহবুবুল করিম এবং সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান, রনি, শাওন, সোহান, জুবায়েরসহ কয়েকজন। সেখানে নাসেরা বেগমের হৃদরোগের চিকিৎসা, স্থায়ী উপার্জনের জন্য একটি দোকান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি বাসা নিয়ে সহায়তা দানের জন্য একটি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্ত্রী নাসেরা বেগমকে বাঁচাতে অনেক টাকা প্রয়োজন লেখা পোস্টার ও ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয় রাজধানীর প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। নাসেরা বেগমের নাতি পরিচয়দানকারী তাপসের নেতৃত্বে অনুদান সংগ্রহ চলে এপ্রিল-মে মাস পর্যন্ত। তহবিল সংগ্রহে কাজ করেছেন এম একজন অরণ্য জানান, ‘অনুদান সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক এবং পরিশ্রমী ছিলেন তাপস। ফলে সবার বিশ্বস্ততা অর্জন করে সে। সংগৃহীত সব টাকা গচ্ছিত রাখা হয় তার কাছে।’ তাপস ইংল্যান্ডপ্রবাসী ছিল বলে সেখান থেকেও কয়েক লাখ টাকা অনুদান সংগ্রহ করেন বলে জানা যায়। অথচ প্রথমে অনুদান তোলা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে জানান নাসেরা বেগম! তিনি বলেন, ‘একদিন কলম বিক্রির জন্য কার্জন হলে গেলে ছাত্রছাত্রীরা জিজ্ঞেস করে, ‘দাদু, আপনি নাকি খুব অসুস্থ? আমরা তো আপনার জন্য টাকা দিয়েছিলাম।’এরপর শিক্ষার্থীরাই তাপসকে ফোন করে। রাতে তাপস নাসেরা বেগমকে ফোনে বলেন, ‘দাদি, আমাদের পেটে তো লাথি মারলেন! কেন ইউনিভার্সিটিতে গেলেন? আপনার জন্য দোকান, বাসা_সব ঠিক করা হচ্ছে।’ এরপর জুনের ৫ তারিখে টিএসসিতে শিক্ষক-সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে নাসেরা বেগমের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হবে বলে ব্লগে সবাইকে জানায় তাপস। কিন্তু দিনকয়েক পরই নগদ টাকা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তাই ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল শাখার অ্যাকাউন্টে তহবিল জমা রাখা হবে বলে জানানো হয় নাসেরাকে। এর মধ্যে তাপস মামলা নিয়ে ঝামেলা থাকায় মাস দেড়েক অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি বলে জানায় মুফিদ। নাসেরা বেগম বলেন, ‘তাপস, রনিরা মাঝে মাঝে খাসির মাংস, মুরগির মাংস, বাসমতি চাল নিয়ে আমার বাসায় আসত। খোঁজখবর নিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে তাপস, নীল এবং আরো দুজন তাঁর বাসায় গিয়েছিল। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। তাপস আমাকে একটি কাগজের প্যাকেট দিয়ে পরদিন মতিঝিলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলবে বলে জানায়। ওই অ্যাকাউন্টে রাখার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ নামে থাকা ২০ হাজার টাকার চেকটিও সই করে তাপসের হাতে তুলে দিই। তাপস আমার মোবাইলে থাকা ওদের সব নম্বর মুছে দেয়। আমাকে নিয়ে বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপিগুলো নিয়ে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর প্যাকেট খুলে দেখি ১০০ টাকার দুটি এবং ৩০টি ১০ টাকার নোট মিলে ৫০০ টাকা রাখা। কিন্তু পরদিন আর তাদের কেউই আসেনি।’ তিন-চার দিন পর এসব ঘটনা ছাত্রদের জানান নাসেরা বেগম। তখন ছাত্ররা তাঁকে মুফিদ, তাপস ও অরণ্যের নম্বর জোগাড় করে দেয়। প্রতিদিন ফোন করলেও তাদের কেউ মোবাইল রিসিভ করে না বলে জানান নাসেরা বেগম। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আর হেঁটে হেঁটে কলম বিক্রি করা লাগবে না। নিজের দোকান হবে। ভালো বাসায় থাকব_এ রকম স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিছুই তো দিল না; উল্টো আমার নম্বর দিয়েছে পর্নোসাইটে। এই বয়সে এসে আজেবাজে লোকের করুচিপূর্ণ কথায় মরে যেতে ইচ্ছে করে!’ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছা্ত্র মুফিদ বিন রাবি্ব জানায়, ‘এর সঙ্গে শুধু একা আমি জড়িত না। ২৬ মার্চ তাপস টিএসসিতে শিল্পী লাকী আখন্দকে নিয়ে এসে নিজের আত্মীয় বলে পরিচয় দেয়। সেদিন থেকে আমরা তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করি। ক্যাম্পাস থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকার মতো উঠেছিল। সব টাকা আমরা তাপস ভাইয়ের কাছে জমা রেখেছিলাম। কলম দাদুর প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি।’ নেটে কলম দাদুর মোবাইল নম্বর তাপসই দিয়েছে বলে জানায় মুফিদ। আরেক অভিযুক্ত অরণ্য বলে, ‘দাদুর অসুস্থ হওয়ার কথা প্রথম জানতে পারি ব্লগের মাধ্যমে। তারপর ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুলি। তাপস, মুফিদের সঙ্গে পরিচয় সেখান থেকেই। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাদুর জন্য পোস্টারিং করেছিলাম। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে দাদুর জন্য পাঁচ হাজার টাকার একটা ভাতারও ব্যবস্থা করে দিয়েছি। বিশ্বাস করে তাপসের কাছে টাকা রাখা হয়েছিল। তাপস যে এভাবে সবার সঙ্গে প্রতারণা করবে, তা জানা ছিল না।’ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা রাখেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন টাকা তোলা হচ্ছিল তখন দাদুর নাগরিক সনদপত্র, ভোটার আইডি কার্ড কিছুই ছিল না। এখন আমরা তাপসকে খুঁজছি। তাকে পেলেই সব জানা যাবে।’ সিটি কলেজের মাহফুজ, জোবায়ের জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হলে তাদের বন্ধুবান্ধদের কাছ থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা তুলে মুফিদকে দেয়। এর পরের ব্যাপার কিছুই জানেন না তাঁরা। বিভিন্ন নম্বর থেকে বেশ কয়েক দিন বারবার ফোন করেও তাপসকে পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাপসের পুরো নাম হামিন আহমেদ তাপস। ১৯৯৮-৯৯ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করে দীর্ঘদিন একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছে। ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব আছে বলেও দাবি করত সে। প্রতারণার ব্যাপারটি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। ‘এটা শুধু কলম দাদুর সঙ্গে প্রতারণা নয়, আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে, মানবতার সঙ্গে প্রতারণা।’ ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী তাহমিনা হক। বাংলা বিভাগের মিজানুর রহমান জানান, প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটি নষ্ট হয়ে যাবে।

উপাচার্যের বক্তব্য

নাসেরা বেগমের সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতারণার কথা জানতে পেরে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘একজন দুস্থ নারীর সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নাসেরা বেগম যদি লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর অভিযুক্তদের শাস্তি চেয়ে আবেদন করেন এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র অভিযুক্ত তাদের নাম উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

Advertisements
Posted in: Bangladesh